Apan Desh | আপন দেশ

মাত্র আটটি হাঁসই মোড় ঘোরালো লেবু মিয়ার

ড. এম বায়েজিদ মোড়ল

প্রকাশিত: ১২:৩৮, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪

আপডেট: ২৩:০৫, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪

মাত্র আটটি হাঁসই মোড় ঘোরালো লেবু মিয়ার

হাসে তাকিয়ে লেবু মিয়া। ইনসেটে ড. এম বায়েজিদ মোড়ল। ছবি: আপন দেশ

মোহাম্মাদ আলী লেবু মিয়ার বয়স ৪৫। সিলেট অঞ্চলের করিম নগর গ্রামে বসবাস করেন তিনি। তার জীবন একসময় ছিল সংগ্রাম, কষ্ট ও অনিশ্চয়তায় ভরা। দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি দিন পার করেছেন। একদিনের খেয়ে আরেকদিনের দিন গুজরান ছিল তার জীবনের নিয়মিত ছবি। পৈত্রিক সম্পত্তি নেই, শুধু এক টুকরো বাস্তুভিটা ও একটি ছোট কাঁচা ঘর। যেখানে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে ২৩ বছর ধরে সংসার করে আসছেন।

বয়স যখন ১২-১৩ তখন থেকেই পেটের খিদে নিবারণ করতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হন লেবু মিয়া। কিন্তু কখনোই পাননি কোনো স্থায়ী সমাধান। যে কাজটি তিনি সারা বছর ধরে করতে পারবেন। একদিকে জীবনযুদ্ধ। অন্যদিকে স্বাস্থ্য সমস্যা—সব মিলিয়ে কোনো সুখ-সাচ্ছন্দ্যে ভরা জীবন কল্পনাও করতে পারেননি তিনি।

তবে কষ্টের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার মনে ছিলও একটুখানি আশা। একদিন যখন লেবু মিয়া সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা অঞ্চলে কাজে যাচ্ছিলেন, তখন হাওড়-বিলে হাজার হাজার হাঁসের ঝাঁক দেখে তার মনে হয়। কেন না তিনি নিজে হাঁস পালন শুরু করেন? যেখানে এত জায়গা ও প্রাকৃতিক সম্পদ। সেখানে হাঁস পালনই তো হতে পারে তার জীবনের স্থায়ী কর্ম।

লেবু মিয়া বুঝতে পারেন যে, নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয়ে হাঁস পালন একটি খুব লাভজনক ও সহজ উপায় হতে পারে। হাঁস পালন করার জন্য প্রয়োজন হয় খুব কম খরচ। একদিকে যেমন তাদের খাদ্য চাহিদা অনেকাংশে স্থানীয় জলাশয়ের পোকামাকড়, শামুক, ছোট মাছ থেকে পূর্ণ হয়। তেমনি হাঁসের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মুরগির চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি হাঁসের ডিম উৎপাদনও বেশি ও তাদের আকার বড় হয়।

লেবু মিয়ার স্ত্রী ময়না তার এ পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, কেননা আমাদের এ অঞ্চলে হাঁস পালনে অনেক সুযোগ রয়েছে। আমাদের চারপাশে ডোবা, নালা, খাল, বিল—এগুলোর মধ্যে হাঁস খুব ভালোভাবে পালন করা সম্ভব। তারপর ময়নার পরামর্শে শুরু হয় হাঁস পালন।

আজ বহু পরিশ্রমের পর লেবু মিয়া সফলভাবে হাঁস পালন শুরু করেছেন। তার এখন একটি ছোট হাঁস খামার রয়েছে। যা তাকে এখন উপার্জনের একটি স্থায়ী পথ দেখাচ্ছে। তার খামারে হাঁসগুলো এখন ভালোভাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবেশী এলাকা থেকেও অনেকে তার কাছ থেকে হাঁস কিনতে আসছে।

স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল হাঁস পালনের ব্যবসা। কিছুটা ঋণ নিয়ে শুরুতে ময়না ও তার স্বামী স্থানীয় হাঁস প্রজনন খামার থেকে দেশী জাতের ৮টি হাঁসের বাচ্চা কিনে আনেন। ময়না। তিনি নিজেই হাঁস পালন বিষয়ক কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। শুরুতেই পরামর্শ দেন যে, ঋণ নিয়ে বড় পরিসরে হাঁস আনা ঠিক হবে না। বরং কম হাঁস নিয়ে ধীরে ধীরে খামার শুরু করা উচিত।

এভাবেই সাতটি মায়া হাঁস ও একটি মোদ্দা হাঁস নিয়ে প্রথমে ছোট খামার শুরু হয়। খামারটি সফল হতে থাকে। কারণ কয়েক মাসের মধ্যে হাঁসগুলো ডিম দেয়া শুরু করে। ছয় মাস পর একসাথে ছয়টি হাঁস ও আট মাস পর সাতটি হাঁস ডিম পাড়া শুরু করে। এরপরে ১ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তারা ৩০০টি হাঁসের বাচ্চা নিয়ে খামারের পরিসর বড় করতে শুরু করেন।

নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় হাঁস প্রজনন খামার থেকে বাচ্চাগুলো সংগ্রহ করা হয়। সেখানে হাঁস পালনের বিষয়ে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেয়া হয়। এ প্রশিক্ষণ তাদের আরও দক্ষ করে তোলে বিশেষত হাঁসের বাচ্চাকে সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য যে তাপ দেয়া প্রয়োজন। সে বিষয়ে তারা জানেন। শীতকালে বাচ্চাদের জন্য ব্রিডিং প্রয়োজন। যা শীতের তীব্রতা থেকে বাচ্চাদের রক্ষা করে।

ছোট অবস্থায় বাচ্চাগুলোর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত সুষম খাবার ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাখি, ইঁদুর, পোকামাকড় ও বন্য জন্তুদের খামারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। মেঝে, বেড়া, অন্যান্য জায়গায় জীবাণুনাশক ঔষধ যেমন আইয়োসান ও ফিনাইল ছিটানো হয়। খামারে যত্নশীলতার কারণে হাঁসগুলো সুস্থ ছিল। নিয়মিত ডিম দেয়ার মাধ্যমে আয় শুরু হয়।

বছরের ভাদ্র আশ্বিন মাসে হাঁসগুলো একসাথে দুইশরও বেশি ডিম পাড়া শুরু করে। এতে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হত। যা ঋণ পরিশোধে সহায়ক হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় কিছু হাঁস ডিম পাড়া বন্ধ করে দেয়। এ সময় তাদের বড় হাঁসগুলো বিক্রি করে নতুন ৯০০টি হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করা হয়।

ছোট বাচ্চাগুলোর খাবার খরচ কম ছিল। পালনের জন্য জায়গাও বেশি প্রয়োজন হয়নি। তবে কিছু বাচ্চা মারা যাওয়ার পর খামারটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। ৮২০টি হাঁসের বড় খামারে পরিণত হয়।

এখন ময়না ও তার স্বামী দুজনে মিলিয়ে হাঁস পালনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের খামারে কিছু কর্মচারীও রয়েছে যারা হাঁসগুলোর দেখাশোনা করে। সকাল বেলা হাঁসগুলোকে বাইরে বের করে বিলের মাঝে চরানোর জন্য পাঠানো হয়। সন্ধ্যায় হাঁসগুলো ঘরে ফিরে আসে।

গত বছর ৮২০টি হাঁস পালনের মাধ্যমে লেবু মিয়া দুই লাখ টাকা আয় করেছেন। এ আয় দিয়ে তিনি নিজ বাড়িতে একটি সুন্দর টিনের ঘর তৈরি করেছেন। বাড়ির পাশে উঠান সংলগ্ন একটি টিনের ছাবড়া ঘর নির্মাণ করেছেন। যেখানে তার হাঁসগুলো রাতে থাকে। এছাড়াও তিনি একটি পুকুরও খুঁড়েছেন। যেখানে হাঁসগুলো জলকেলি করতে পারে। হাঁসের বাচ্চাগুলোর জন্য এ পুকুরেই পালনের ব্যবস্থা করেছেন।

এখন লেবু মিয়া তার আগামী মৌসুমে আরও ৫০০ বাচ্চা হাঁস আনার পরিকল্পনা করেছেন। হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহের জন্য তিনি যোগাযোগ করেন কেন্দ্রীয় হাঁস প্রজনন খামার, হাজীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার, দৌলতপুর, খুলনা। প্রতি মাসের ৫, ১০, ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ তারিখে হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করা হয়। যা লেবু মিয়ার মতো উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ।

লেবু মিয়ার সঙ্গে তার দুজন কর্মচারী রয়েছেন। গ্রামেরই একজন ব্যক্তি তার কাছ থেকে হাঁসের ডিম ক্রয় করে শহরের বিভিন্ন হোটেল ও দোকানে সরবরাহ করে। এতে স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নও হচ্ছে। গ্রাম্য মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে এক নতুন মাত্রা।

যদিও লেবু মিয়া পড়াশোনা জানেন না, তবে তার স্ত্রী ময়না বেগম প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন। তাদের পরিকল্পনা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের জন্য একটি হ্যাচারি স্থাপন করার। তাদের লক্ষ্য হলো আশেপাশের গ্রামের লোকজন যেন হাঁস পালন করে। ভালো উপার্জন করতে পারে।

লেবু মিয়ার মতো উদ্যমী মানুষদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হাঁস পালন হতে পারে একজন শিক্ষিত বা অশিক্ষিত বেকার যুবক/যুবতির দারিদ্র্য বিমোচনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

আপন দেশ/এমবি
 

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়