
ছবি : সংগৃহীত
ঘন কুয়াশায় উনুনের ধোঁয়ার মতো ভোরের স্নিগ্ধ আলো। গাছের ডগায় শিশিরের পরশ দিয়ে প্রকৃতি থেকে বিদায় নিচ্ছে ঋতুরানী হেমন্ত। তার আগেই ছড়িয়েছে শীতের আবেশ। কাঁচা বাজারে থরেথরে সাজানো শীতকালীন নানা জাতের সবজি।
কিন্তু সেগুলো কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মানুষকে। একটা সময় অল্প টাকায় ব্যাগ ভরে যেত সবজিতে, আর এখন সবজি কিনতেই পকেট ফাঁকা হয়ে যায়। তবে সরবরাহ বাড়ায় আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে সবজির দাম। এতে ক্রেতারা সামান্য স্বস্তি পেলেও বিপাকে ফেলেছে ভোজ্যতেল।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে এ দৃশ্য দেখা গেছে। বাজারগুলোয় নতুন আলুর দাম গত এক সপ্তাহের তুলনায় বেশ কমেছে। এ ছাড়া পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিপ্রতি ২০ টাকা। তবে পুরোনো আলু ও পেঁয়াজের দাম আগের মতোই রয়েছে।
রাজধানীর কমলাপুর, মুগদা, ফকিরাপুলসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে তিন ধরনের আলু বিক্রি হতে দেখা যায়—দেশি ও আমদানি করা পুরোনো আলু এবং নতুন দেশি আলু। এর মধ্যে পুরোনো আলু বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি। নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহ আগে নতুন আলু কিনতে হয়েছে কেজিপ্রতি ১২০-১৩০ টাকায়।
এ ছাড়া চার ধরনের পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা যায় বাজারে। এগুলোর মধ্যে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা কেজি, যা এক সপ্তাহ আগে ১০০-১২০ টাকা ছিল। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা কেজি, এক সপ্তাহ আগে যা ১২০-১৩০ টাকা কেজি ছিল। এ ছাড়া বাছাই করা কিছু দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা কেজি। বাজারে পাতাসহ মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়েছে, এগুলোর দাম কেজিপ্রতি ৬০-৭০ টাকা রাখছেন বিক্রেতারা।
পাইকারি বাজারগুলোয় এসব পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে। শ্যামবাজারে পাইকারিতে নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ৭০-৭২ টাকা কেজি। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭৫-৭৬ টাকা কেজি। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০-৯৫ টাকা কেজি।
দেশে মূলত আলু ও পেঁয়াজের মূল মৌসুম শুরু হয় জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে। তবে এর মধ্যে আগাম জাতের কিছু আলু ও পেঁয়াজ চাষ করেন উত্তরাঞ্চলের চাষিরা। এগুলো পরিমাণে অল্প হলেও বাজারে দামের উত্তাপকে কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
রাজধানীর কমলাপুর বাজারের সবজি ও পেঁয়াজ বিক্রেতা আরিফুর রহমান বলেন, বাজারে আলু ও পেঁয়াজের সরবরাহ গত এক সপ্তাহে দ্বিগুণ বেড়েছে। কারণ, আমদানির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় আগাম জাতের পণ্যও বাজারে আসছে। এই আগাম আলু-পেঁয়াজ শেষ হলেই মূল মৌসুমের পণ্য চলে আসবে। তাই এখন আর আলু-পেঁয়াজের দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে কতটা কমবে, তা কৃষকের উৎপাদন খরচের ওপর নির্ভর করবে।
আলু ও পেঁয়াজের দাম দ্রুত কমলেও সবজির দাম কমছে খুবই ধীরগতিতে। বাজারে টমেটোর কেজি এখনো ১৩০-১৫০ টাকা কেজি। অথচ শীতের অন্যান্য সবজির মতো দেশি টমেটোর সরবরাহও বেড়েছে।
রাজধানীর ফকিরাপুল বাজারের ক্রেতা মান্নান বলেন, সরকার বাজার ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খাচ্ছে। একটার দাম কমলে আরেকটা বেড়ে যাচ্ছে। যেসব পণ্যের দাম কমছে, তাতে সরকারের তেমন কোনো কৃতিত্ব নেই। সরবরাহ বাড়তে থাকায় কমছে। কিন্তু দাম কমার এ স্বস্তি ক্রেতা ভোগ করতে পারছে না। যথাযথ সরকারি উদ্যোগের কারণে কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে, কিছু পণ্যের ঘাটতি হচ্ছে।
বাজারে শিম বিক্রি হয়েছে ৮০-১০০ টাকা কেজি, কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা, শালগম ৮০ টাকা, কাঁচা টমেটো ৮০ টাকা, পটোল ৮০ টাকা, বেগুন ৬০-৮০ টাকা, গাজর ১২০ টাকা, উচ্ছে ১২০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, বরবটি ১২০ টাকা, ক্ষীরা ৬০ টাকা, শসা ৮০ টাকা, পেঁপে ৬০ টাকা, ধনেপাতা ১৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ফুলকপি ৪০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ টাকা ও লাউ ৫০-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে এসব সবজির মধ্যে বেগুন, কাঁচা টমেটো, ক্ষীরা, বাঁধাকপি ও ফুলকপির মতো গুটিকয়েক সবজির দাম ৫-১০ টাকা কমলেও বাকিগুলো আগের মতোই রয়েছে।
বিক্রেতা জামাল মিয়া বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর রাজধানীর পাইকারি বাজারগুলোয় কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রাক ঢুকতে না দেয়া। বিশেষ করে কারওয়ান বাজারে সবজির ট্রাক ঢুকতে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া রাস্তাঘাট ভাঙা থাকায় যাতায়াতের ভাড়াও বেশি লাগছে। এসব খরচ সবজির সঙ্গে সমন্বয় করছেন বিক্রেতারা। তাই দাম কিছুটা বাড়তি।
এদিকে গত কয়েক দিন ধরেই তেলেসমাতি কারবার হচ্ছে সয়াবিন তেল নিয়ে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও দোকানি বলে দিচ্ছেন, তেল নেই। এ নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় কিম্বা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কোনো কিছু দৃশ্যমান হচ্ছে না।
দাম বাড়ার তিন দিন পরও ভোজ্যতেলের সরবরাহ না বাড়ায় অস্বস্তিতে রয়েছেন বিক্রেতারা। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, দোকানগুলোয় এখনো ভোজ্যতেলের সরবরাহ দেননি ব্র্যান্ড কোম্পানির প্রতিনিধিরা। অথচ গত সোমবার প্রতি লিটার তেলের দাম ৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
মুগদার বাজারের পাঁচটি মুদিদোকানের একটিতেও সয়াবিন তেল নেই। শুধু একটা দোকানে ৫ লিটারের পাম তেলের বোতল পাওয়া গেল।
এ বিষয়ে বিক্রেতা বলেন, কোম্পানির লোকজন তেলের সরবরাহ না দেওয়ায় ঠাটারিবাজার থেকে রিকশায় করে এই তেলগুলো কিনে আনলাম। গায়ের মূল্য ৮৫০ টাকা আর আমি কিনে আনলাম ৮৪০ টাকায়। লিটারে যে ২ টাকা কম রেখেছে, তা রিকশাভাড়াতেই চলে গেছে। এখন এ তেল বিক্রি করে আমার কোনো লাভ থাকবে না। তারপরও ক্রেতা ধরে রাখতে এই পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।