
দারার রাস্তায় স্প্রে পেইন্টে লেখা ‘এজাক এল দরজা, ইয়া ডাক্তার’ যার অর্থ ‘এবার আপনার পালা ডাক্তার’। ছবি: সংগৃহীত
সময়টা তখন ২০১১। দক্ষিণ সিরিয়ার দারার একটি রাস্তায় গ্রাফিতি এঁকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় ১৪ বছর বয়সি এক কিশোর। আর তার এ গ্রাফিতিই বদলে দেয় সিরিয়ার ভাগ্য।
১৪ বছর বয়সি মৌয়াবিয়া সায়সনেহ দারার ওই রাস্তায় স্প্রে পেইন্টে লেখে, ‘এজাক এল দরজা, ইয়া ডাক্তার’ যার অর্থ ‘এবার আপনার পালা ডাক্তার’। গ্রাফিতিটিতে ডাক্তার বলে নির্দেশ করা হয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে।
প্রসঙ্গত, দামেস্কের ইউনিভার্সিটি থেকে চক্ষুবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন আসাদ। হতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক। এমনকি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চক্ষুবিজ্ঞানের উচ্চতর পড়াশোনাও করেন তিনি। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় তার বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর বাবার নির্দেশে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর সিরিয়ায় সামরিক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
আসাদকে উদ্দেশ করে লেখা মৌয়াবিয়ার ওই গ্রাফিতিই জাতীয় বিদ্রোহের অনুঘটক হয়ে ওঠে। আর জন্ম দেয় ২১ শতকের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধের।
আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এই কাজটি দ্রুত এবং নৃশংস প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ গ্রাফিতির কারণেই স্থানীয় পুলিশের হয়রানির শিকার হয় মৌয়াবিয়া ও তার বন্ধুরা।
গোপন পুলিশ বা মুখাবরাত তাদের ২৬ দিন আটকে রাখে। অত্যাচার ও মারধর করে যা শেষ পর্যন্ত দারার বাসিন্দাদের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছিল। তার মুক্তির দাবিতে বাবা-মা, প্রতিবেশী ও আন্দোলনকারীরা যারা প্রতিবাদ করেছিল তাদের সবাইকে টিয়ার গ্যাস ও বুলেটের মুখোমুখি হতে হয়।
ওই কিশোরদের মারধর করার ছবি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি জনসাধারণকে একত্রিত করে। বিক্ষোভ শুধু দারাতেই নয়, শুরু হয় সিরিয়াজুড়ে। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ সিরিয়ায় প্রথমবারের মতো ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু হয়। আর স্থানীয় এ আন্দোলন স্বাধীনতা ও আসাদের শাসনের অবসানের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভে রূপান্তরিত হয়।
দ্য ডমিনো ইফেক্ট
শান্তিপূর্ণ এই বিক্ষোভকে নৃশংস করে তোলে আসাদ বাহিনী। নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালায়, ভিন্নমতাবলম্বীদের বন্দি করে আর অগণিত সিরিয়ানকে নির্যাতন শুরু করে। ‘আরব বসন্ত’ থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া এ আন্দোলন দ্রুতই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়। যার ফলে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করা বিরোধীরা হাতে অস্ত্র তুলে নেন।
এরইমধ্যে ২০১১ সালের জুলাই মাসে আবির্ভূত হয় ফ্রি সিরিয়ান আর্মি (এফএসএ)। আসাদের সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগকারী সেনাদের নিয়ে গঠন করা এ সংগঠন সংহতি ও সম্পদের অভাবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। আর এ সময় বিশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক ফাটলকে পুঁজি করে বেড়ে উঠতে থাকে জাভাত আল-নুসরা। পরে ইসলামিক স্টেটের মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো।
সে ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে সিরিয়া। নিহত হয়েছেন ৫ লাখেরও বেশি মানুষ, আহত ও বাস্ত্যুচ্যুত হয়েছে ১৩ মিলিয়নেরও বেশি বাসিন্দা।
তবে সিরিয়ায় দীর্ঘ ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে পারলেও, এবার মাত্র ১২ দিনে পতন ঘটল বাশার আল-আসাদের ২৪ বছরের শাসনামলের। গেল ২৭ নভেম্বর আলেপ্পোতে প্রবেশের পর অপ্রতিরোধ্য গতিতে সিরিয়ার একের পর এক শহর নিয়ন্ত্রণে নিতে থাকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম।
রোববার (৮ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করতে শুরু করেন বিদ্রোহীরা। এর মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে পালান। সূত্র: এনডিটিভি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।