Apan Desh | আপন দেশ

ইডেন ক্রিকেট মাঠে গোষ্ঠ পালের বেড়া ও ইংরেজ সাহেবদের চাইনিজ ওয়াল...

অজয় বসু

প্রকাশিত: ১৮:০১, ২ এপ্রিল ২০২৫

আপডেট: ০২:৪৭, ৩ এপ্রিল ২০২৫

ইডেন ক্রিকেট মাঠে গোষ্ঠ পালের বেড়া ও ইংরেজ সাহেবদের চাইনিজ ওয়াল...

চীনের মহা প্রাচীর ও গোষ্ঠ পাল। ছবি: কৃষ্ণেন্দু মন্ডল

সেদিন ধুতি পরেই ইডেনে ক্রিকেট খেলতে নেমেছিলেন ভারতীয় ফুটবলের কিংবদন্তি, চীনের প্রাচীর গোষ্ঠ পাল। ইংরেজরা প্রবল আপত্তি করেছিল তাঁর ধুতি নিয়ে,পাত্তা দিলেন না গোষ্ঠ। এরপরের ইতিহাস ইংরেজদের সঙ্গে  প্রবল বিবাদ। ইডেনে ক্রিকেট মাঠে গোষ্ঠর মালকোঁচা কষে ফিল্ডিং সাহেবদের কাছে যেন বাঙালির চরম ঔদ্ধত্য..। 

খাস বিলিতি সাহেবদের অভিজাত ক্যালকাটা ক্লাবের আঙিনা ইডেনে তখন বিনা প্রয়োজনে ইঙ্গ-ভারতীয়রা ঢোকার সাহস পেত না, আর নেটিভ গোষ্ট পাল কিনা ধুতি পরেই সাহেব-মেম সাহেবদের তাচ্ছিল্য করে মাঠে নেমে গেলেন! মালকোঁচা কষে ফিল্ডিং করছিলেন। কয়েক ওভার হাতও ঘুরিয়ে নিলেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে স্বাধীনতা সংগ্রাম আরম্ভ হয়েছে, সেই যুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়েছে কলকাতার ফুটবল মাঠে। সেখানেও পরস্পরের মুখোমুখি হত ইংরেজ আর ভারতীয় দলগুলি।সেকালের ক্যালকাটা, ডালহৌসি, অপরপক্ষে মোহনবাগান৷ সে লড়াইকেও ইংরেজদের সঙ্গে ভারতীয়দের মুখোমুখি সংঘর্ষের প্রতীক মনে করা হতো৷

সেদিন ছিল ইডেন উদ্যানে খাস বিলিতি সাহেবদের ক্লাব ক্যালকাটার সঙ্গে মোহনবাগানের ক্রিকেট ম্যাচ৷ ইংরেজ রাজকুমার ডিউক অফ কেন্ট কলকাতায় এসে পড়ায় চৌরঙ্গি পাড়ায় মহা শোরগোল। ধুমধামের শেষ নেই, পথঘাট বন্ধ বলা যায়, ভিড় ঠেলে যখন গোষ্ঠবাবু মাঠে পৌঁছে ছিলেন তখন খেলা আরম্ভ হয়েছে, ক্যালকাটা ব্যাট করছে, মোহনবাগান ফিল্ডিং৷ দেরি হয়েছে, গোষ্ঠবাবু তাড়াতাড়ি মাঠে নেমে পড়লেন, বদলি খেলোয়াড় বিশ্রাম নিলেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা<<>> বাঙালি চুপ করে থাকে চাকরির ভয়ে

ক্যালকাটার ব্যাটসম্যানেরা প্রায় দু'ঘন্টা গোষ্ট পাল ও তাঁর সতীর্থদের মনের সুখে খাটিয়ে নিলেন। এরপরে গোষ্ট পালের ধুতি নিয়ে আপত্তি করলেন ক্যালকাটা দলের দুই মাতব্বর, অর্থাৎ নেটিভ পোশাকে খেলা চলবে না৷ সেইসময় ক্যালকাটা ক্লাবের আঙিনা ইডেনে বিনা প্রয়োজনে ইঙ্গ-ভারতীয়রা ঢোকার সাহস পেত না, আর নেটিভ গোষ্ট পাল কিনা ধুতি পরে সাহেব-মেম সাহেবদের তাচ্ছিল্য করে মাঠে নেমে গেলেন..। 

অপমানবোধে সাহেবদের মুখ লজ্জায় রাঙা হল, মোহনবাগানও ছাড়ার পাত্র নয়, একে ঘন্টা দুই ফিল্ডিং করতে হয়েছে, যতক্ষন ওরা ব্যাট করল আপত্তি উঠল না যখন নিজেদের ফিল্ডিংয়ের পালা তখন কিনা পোশাক নিয়ে তুচ্ছ অছিলা তোলার চেষ্টা মোহনবাগানের অধিনায়ক ফকির মুখার্জি কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন ক্যালকাটা ক্লাবের মাতব্বরদের৷ 

বিশ্বের সেরা তিন মাঠের অন্যতম কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স। ছবি: সংগৃহীত

বলা বাহুল্য ভাঙল আসর, মোহনবাগানের খেলোয়াড়রা লাঞ্চ পেলেন না, সত্যি বলতে এ ঘটনার পরে অনেক বছর ক্যালকাটা আর মোহনবাগানের মধ্যে ক্রিকেট খেলা হয় নি৷ ফুটবল কিংবদন্তি গোষ্ঠ পালের দেশি পোশাক পরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার দুই প্রধান ক্রিকেট দলের মধ্যে সম্পর্কে চিড় ধরেছিল, ক্ষমতা হস্তান্তর, সাহেবদের বিষ দাঁত ভাঙার পরে সে সম্পর্ক আবার জোড়া লাগে৷

১৯১১সালের ঐতিহাসিক শিল্ড জয়ে উৎসাহিত হয়ে বাঙালিয়ানা তথা স্বদেশীয়ানার পুরোধা হয়ে যখন মাঠে ময়দানে ইংরেজ-গোরাদের সঙ্গে চোয়াল কষে লড়ছে মোহনবাগান। তখন সব শক্তি সংহত হয়েছিল ওই গোষ্ঠ পালকে ঘিরে, কথাশিল্পী কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখনীতে আছে...।

 “দেউলের শোভা যেমন চুড়ো, তেমনি মোহনবাগানের শোভা গোষ্ঠ পাল, যাকে বলে নায়ক নাটকের প্রধান পুরুষ, ধীরোদাত্ত, ধীরোদ্ধত, ধীর, প্রশান্ত৷ সাহেবরা যাকে বলে চাইনিজ ওয়াল..!

হ্যাঁ এ চাইনিজ ওয়াল নিজের ঘর সামলাতেন, বিপক্ষের প্রত্যাঘাত গুড়িয়ে দিতেন৷ বার্মার রেঙ্গুন কাস্টমস শিল্ড খেলতে কলকাতায় এলো। নামকরা দল, কিন্তু মোহনবাগানের সঙ্গে খেলার দিন গোষ্ঠ পাল একা মাঠজুড়ে খেলে দিলেন। গোষ্ট পালের বেড়া ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়া অসাধ্য হল রেঙ্গুন কাস্টমসের পক্ষে৷ পরের দিন তদানীন্তন পত্রিকা 'ইংলিশম্যানে' বড় হরফে গোষ্ঠ পাল 'চাইনিজওয়াল' বলে অভিনন্দিত হয়ে গেলেন৷ সে থেকেই তাঁর আরেক নাম চীনের প্রাচীর। -তথ্যসূত্রঃ ফিরে ফিরে চাই (অজয় বসু)

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়